ঢাকা , সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬ , ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৪০ বছরের ভোগান্তির অবসান

কুয়াকাটায় পর্যটন যোগাযোগে নতুন দিগন্ত

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ০২-১১-২০২৬ ১১:৩৮:৫৭ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় : ০২-১১-২০২৬ ১১:৩৮:৫৭ পূর্বাহ্ন
কুয়াকাটায় পর্যটন যোগাযোগে নতুন দিগন্ত ফোকাস বাংলা নিউজ
কুয়াকাটার সূর্যোদয়ের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে গঙ্গামতি সৈকতে যেতে পর্যটকদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি এবার শেষ হতে যাচ্ছে। বেড়িবাঁধসংলগ্ন খালের ওপর নির্মিত ৩০ মিটার দীর্ঘ গার্ডার ব্রিজটি চালু হলে গাড়ি নিয়ে সরাসরি গঙ্গামতি সৈকতে পৌঁছানো যাবে। একই সঙ্গে বেড়িবাঁধের বাইরে বসবাসকারী দেড় সহস্রাধিক মানুষের, বিশেষ করে জেলে পরিবারের, দীর্ঘ ৪০ বছরের দুর্ভোগ লাঘবের পাশাপাশি দুর্যোগের সময় নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথ সুগম হবে।

তিন কোটি ১৫ লাখ ৫৯ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত ব্রিজটির মূল কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে চলছে সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এটি চালু হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ব্রিজের দুই পাশে বেড়িবাঁধসংলগ্ন ৫৫ মিটার এলাকায় পর্যটকদের গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য নান্দনিক পার্কিং জোন তৈরির কাজও চলছে।

ব্রিজটি চালু হলে কুয়াকাটার পর্যটন যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যুক্ত হবে। সৈকতের বিভিন্ন অংশে যাতায়াত সহজ হওয়ার পাশাপাশি বর্ষা ও জোয়ারের সময় গঙ্গামতি সৈকতে পৌঁছানোর প্রতিবন্ধকতা দূর হবে। একই সঙ্গে বেড়িবাঁধের বাইরে বসবাসকারী মানুষের দৈনন্দিন চলাচল ও দুর্যোগকালীন নিরাপত্তায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

গতকাল রবিবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ব্রিজের নিচের গঙ্গামতির খালে গোসল করছেন বেড়িবাঁধের বাইরের বাসিন্দা ৫০ বছর বয়সী মোশাররফ বিশ্বাস। তিনি জানান, খালের দক্ষিণ পাড়ে বেড়িবাঁধের বাইরে প্রায় ৪০ বছর ধরে বসবাস করছেন। স্থানীয়ভাবে খালটি গঙ্গামতির খাল নামে পরিচিত। এর সঙ্গে গঙ্গামতির লেকের সংযোগ রয়েছে। খালটিতে এখনো ৩ থেকে ৪ ফুট পানি থাকে। স্থানীয়রা এই পানি গোসল ও রান্নার কাজে ব্যবহার করেন। তবে অনেকে খালটিতে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করছেন বলেও জানান তিনি।

সিডরের ভয়াবহ স্মৃতি তুলে ধরে মোশাররফ বিশ্বাস বলেন, “সিডরের সময় পানির চাপ সইতে না পেরে তার ভাইয়ের ছেলে দুই বছরের কালাচান বাবা-মায়ের হাত থেকে ছুটে গিয়ে মারা গেছে। খালটিতে স্রোতের চাপ ছিল। সাঁতরে সবাই বাঁধের ভেতরে আশ্রয় নিতে আসছিলেন। তখন এই ব্রিজটি হলে এমন মৃত্যু হতো না।”

মোশাররফ বিশ্বাসের ভাষ্যমতে, বেড়িবাঁধের বাইরে প্রায় ৬০০ ভোটার রয়েছেন। অন্তত ৪০০ জেলে পরিবারের দেড় সহস্রাধিক মানুষের চলাচলের পথ সহজ করবে এই ব্রিজ।

ব্রিজের নিচের খালের পানিতে ডুবাচ্ছিল সাত বছরের শিশু রবিউল। প্রথম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী জানায়, বর্ষার কয়েক মাস তাদের নানা সমস্যার মধ্যে কাটে। খালে পানি বেড়ে যাওয়ায় স্কুলে যেতে পারে না। ব্রিজটি চালু হলে তার স্কুলে যাতায়াত সহজ হবে।

স্থানীয় বাসিন্দা মুসা বিশ্বাস জানান, ব্রিজটি চালু হলে তাঁদের প্রায় ৪০ বছরের দুর্ভোগের অবসান হবে। একই প্রত্যাশার কথা জানান মো. মহসিন ও মো. দেলোয়ার হোসেন। মিজানুর রহমান বলেন, একটি মহল ব্রিজ নির্মাণের বিরোধিতা করে খাল ও সংযোগ সড়ক নেই বলে প্রচার করেছে। কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে ব্রিজ নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়েও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।

বর্তমানে কুয়াকাটা জিরো পয়েন্ট থেকে পশ্চিম দিকে লেম্বুরবন পর্যন্ত সৈকত ধরে চলাচলে তেমন সমস্যা হয় না। তবে গঙ্গামতি পর্যন্ত যেতে হলে জিরো পয়েন্ট থেকে সৈকত ধরে যেতে হয়। নতুন ব্রিজটি চালু হলে ৩৩ কানি-সংলগ্ন এলাকা থেকে সরাসরি সৈকতে পৌঁছানো যাবে। এতে পর্যটকদের জন্য বিকল্প যোগাযোগপথ তৈরি হবে এবং সৈকতের বিভিন্ন অংশে যাতায়াত আরও সহজ হবে।

ব্রিজটির গুরুত্ব পর্যটন যোগাযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বেড়িবাঁধের বাইরে বসবাসকারী জেলে জনগোষ্ঠীর জন্য এটি হবে নিরাপদ যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বর্ষা মৌসুমে গঙ্গামতির ওই খালে ৫ থেকে ৮ ফুট পানি থাকে। তখন খাল পার হয়ে বেড়িবাঁধের ভেতরে যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়ে। ব্রিজটি চালু হলে এই সমস্যা অনেকটাই দূর হবে। বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড়সহ দুর্যোগের সময় বেড়িবাঁধের বাইরের বাসিন্দারা দ্রুত বাঁধের ভেতরে অবস্থিত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারবেন।

কলাপাড়া উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালের ১৭ আগস্ট তিন কোটি ১৫ লাখ ৫৯ হাজার টাকা ব্যয়ে ব্রিজটি নির্মাণের কার্যাদেশ দেওয়া হয় ঠিকাদার মো. মহিউদ্দীন আহমেদকে। নির্মাণকাজ শুরু হলেও ২০২৪ সালের পর তা বন্ধ হয়ে যায়। সম্প্রতি আবার সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। ব্রিজের ওপারে দক্ষিণ দিকে সাগরপাড়ে যেতে পুরনো প্রায় ১২০০ মিটার সড়কের উন্নয়নকাজও শিগগিরই শুরু হবে।

কলাপাড়া উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, “এটি বাস্তবতার নিরিখে কুয়াকাটার উন্নয়নে করা হয়েছে। পর্যটকরা দ্রুত আরেকটি স্পট থেকে সৈকতে যাওয়ার পাশাপাশি বেড়িবাঁধের বাইরের জনগোষ্ঠী দ্রুত বাঁধের ভেতরে আসা-যাওয়া করতে পারবেন। আর খালটি বর্ষায় ৫-৮ ফুট পানিতে ডুবে থাকে।”

স্থানীয়দের মতে, ব্রিজটি চালু হলে কুয়াকাটার পর্যটন অবকাঠামোর উন্নয়নের পাশাপাশি শত শত জেলে পরিবারের দৈনন্দিন যোগাযোগ, দুর্যোগকালীন নিরাপত্তা এবং সৈকতের বিভিন্ন অংশে পর্যটকদের যাতায়াতে বহুমুখী সুবিধা সৃষ্টি হবে। তবে পর্যটন এলাকার সৌন্দর্য বাড়াতে ও খাল দখল ঠেকাতে খালটি খনন করা জরুরি। নইলে ভরাট খালটি দখল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ